বুধবার, ১৪ জুন, ২০১৭

শিবঠাকুরের আপন দেশে





বরফেমোড়া ভারমোরের মন্দির চত্বর 

ভারমোর, হিমালয়ের প্রত্তন্ত প্রান্তে এক পাহাড়ঘেরা  দেশ- রূপোলি চূড়ায় চারপাশ মোড়া , বাইরের মানুষের আনাগোনা সেভাবে নেই বললেই চলে, সেখানকার মানুষেরা আছে নিজের মত,আনন্দে উৎসবে মগ্ন।

বাঙালী, বরাবরই ভ্রমনপ্রিয় জাতি হিসাবে পরিচিত। এই সময় কয়েকদিনের ছুটিতে অনেকেই তো বেড়িয়ে পড়ে পাহাড় কিম্বা সমুদ্রের হাতছানিতে,  হোক না  কেন আমাদের এবারের গন্তব্য সেই দেশে যেখানে আছে মন্দির -  মৃত্যুর দেবতার।

হিমাচলের বিখ্যাত ভ্রমণস্থল তথা জেলাসদর চাম্বা থেকে মাত্র ষাট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ছোট্ট শহরটি কিন্তু একেবারেই অজানা তা নয়, এটি বিখ্যাত মনিমহেশ যাত্রার জন্য। হ্যাঁ, মনিমহেশ যাত্রার সূচনা হয় এই স্থান থেকেই। পঞ্চকৈলাশের মধ্যে একটি হল হিমাচল প্রদেশে অবস্থিত মনিমহেশ কৈলাশ। এই ভারমোর গ্রামে মাতা ব্রহ্মানীর মন্দিরে পূজা দিয়েই এই যাত্রার শুভারম্ভ হয় শ্রাবন মাসে। তখন এখানে একমাসের জন্য এক বিশাল মেলা চলে।ভারত তথা বিশ্বের অন্য প্রান্ত থেকেও তীর্থযাত্রীরা আসে।

ভারমোর বা পুরানমতে যার নাম ব্রহ্মপুরা।৯২০ খ্রীষ্টাব্দে রাজা মেরু বর্মনের হাতে প্রতিষ্ঠিত এই শহর আজও সাধারন পর্জটকদের কাছে অধরাই থেকে গেছে অনেকাংশে।

ভারমোর সম্পর্কে কথিত আছে, ব্রহ্মানীর বাগিচা হিসাবে একে মানা হত, এ থেকেই নামের সৃষ্টি। এই নিয়ে একটি বিখ্যাত লোকগাথা প্রচলিত আছে।
শোনা যায়, প্রায় ৭০০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত হিমালয় ঘেরা এই সুন্দর শহরে আগে মাতা ব্রহ্মানী বাস করতেন। তিনি ছিলেন ব্রহ্মচারিনী। তাই পুরুষের আগমন ছিল নিষিদ্ধ।একবার ভস্মাসুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ভগবান শিব যখন পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন সেসময় তিনি দেবীর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। দেবী প্রথমে আপত্তি জানালেও শিবের অনুরোধে রাজী হন আর শিবকে জায়গা ছেড়ে নিজে কিছুটা উপরে এক পর্বতে থাকতে যান এক রাতের জন্য।

দেবীর পুরুষবিদ্বেষের কথা জ্ঞাত হয়ে শিবঠাকুর এক রাতের মধ্যে সেই স্থলে চুরাশিটি শিবলিঙ্গের ও মন্দিরের স্থাপনা করেন। সেই মন্দির আজও ভারমোরে বিরাজমান “ চুরাশি মন্দির কমপ্লেক্স” রূপে।
চুরাশি মন্দির চত্বর 


ফিরে এসে এই দৃশ্য দেখে দেবী সহজাতভাবেই খুব ক্রোধিতা হন আর তৎক্ষনাৎ সেই স্থান ত্যাগ করার সংকল্প করেন। দেবীর ক্রোধ প্রশমিত করার জন্য শিবঠাকুর বর দেন যে কৈলাশ যাবার আগে দেবীর পূজা না করে গেলে যাত্রা অসম্পূর্ন থাকবে। তাই আজও এই প্রথা বিদ্যমান।পাহাড়ের উপরে দেবীর পূজা সেরে কুন্ডে স্নান করে তবে যেতে হয়। দেবীর মন্দির পাহাড়ের উপরে, আশেপাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে মনে হয় বুঝিবা কোন অন্য জগতে চলে এসেছি।

চুরাশি মন্দির কমপ্লেক্স ভারমোরের এক অন্যতম  দ্রষ্টব্য স্থান। এখান থেকে দাঁড়িয়ে হিমালয়ের মনোরম দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
চুরাশি মন্দির কমপ্লেক্সে শিবঠাকুরের মূর্তি ছাড়াও আছে নৃসিংহ ঠাকুরের মন্দির, চিত্রগুপ্তের মূর্তি আর আছে ধর্মরাজের মূর্তি- যা সারা বিশ্বের মধ্যে একমাত্র এখানেই আছে। এই সম্পর্কে একটা কথা শোনা যায়- মৃত্যুর পর আত্মাকে এখানে আসতে হয়। এখানেই নাকি চলে বিচারসভা। কর্মের হিসাবের খাতা মিলিয়ে দেখা হয় আত্মার গন্তব্য নরক না স্বর্গ, আর সেই মত তার সামনে খুলে যায় অদৃশ্য দরজা। যে দরজা নাকি রইয়েছে এই মন্দিরে। কাহিনীর সত্যাসত্য বিচার করার উপায় নেই , অন্তত  জীবিতকালে, কিন্তু বেশ অদ্ভূত একটা অনুভূতি হচ্ছিল এই লোকগাথা স্থানীয় পূজারীর মুখ থেকে শোনার সময়।

ভারমোর শুধু মনিমহেশই না, আরও কিছু ট্রেক রুটের কেন্দ্রস্থল আর প্রচুর বিদেশীর সমাগম ঘটে এখানে এখানে, সেইসব অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে। এখান থেকে মনিমহেশ ছাড়াও কুগতিপাস, ইন্দ্রহার পাস ট্রেক, ছোবিয়া পাস ট্রেক প্রভৃতি বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার ট্রেক আয়োজিত হয় ভারমোর ট্রেকিং গ্রুপের উদ্যোগে।
ভারমোর থেকে হাডসার যাবার পথে আছে সেই জায়গা, হাডসার,  যেখান থেকে শুরু হয় মনিমহেশের জন্য পদব্রজে যাত্রা। যাত্রার প্রধান দ্বারের সাথেই আছে শিব পার্বতীর যুগলমূর্তি। সেখানে পুজা দিয়েই শুরু হয় পবিত্র কৈলাশযাত্রা।
মনিমহেশ কৈলাশ যাত্রাপথের  শুরুতে পথের  দৃশ্য


ভারমোর থেকে হাডসার হয়ে আরো কিছুটা এগোবার পথে পড়েছিল অপূর্ব কিছু জলপ্রপাত। বিশাল আকার নিয়ে গর্জন করে তাদের ঝাঁপিয়ে পড়া দেখতে দেখতে কেটে যেতে পারে বেশ কিছুটা সময়।
আর যার কথা না বললে এ লেখা অসম্পূর্ন থেকে যায় তা হল, ভারমোরের বিখ্যাত সোনালি আপেল, যা স্বাদে অপূর্ব, কিন্তু তার সৌভাগ্য আমাদের কমই হয় , কারন তার প্রায় বেশীরভাগটাই চলে যায় বিদেশে।

ভারমোর থাকার জন্য আছে সরকারি বনবাংলো, যার বুকিং ডালহৌসি থেকে হয়,অনলাইনেও করা যেতে পারে।কেউ চাইলে ee-bhar-hp@nic.in এই মেল আইডিতে যোগাযোগ করতে পারে। আছে হিমাচল টুরিজমের রেস্ট হাউসও। আছে বেশ কয়েকটি বেসরকারি হোটেল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হোটেল ভারমোর ভিউ(৯৮১৬৫৯৮১৩০), হোটেল চৌরাশি, হোটেল গৌরিকুন্ড প্রভৃতি।


আর যাবেন কিভাবে?কোলকাতা বা দিল্লী থেকে ট্রেনে করে চলে যান পাঠানকোট রেলস্টেশনে, সেখান থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে যেতে পারবেন ভারমোর। সরাসরি বাস আছে, অথবা চাম্বাতে একরাত থেকে তারপরেও  যেতে পারেন।

 ডালহৌসি থেকে বা চাম্বা থেকে রয়েছে এইচআরটিসি এর বাস। অথবা ডালহৌসি ট্যাক্সি ইউনিয়ন থেকে সরাসরি ট্যাক্সি বুক করে দুপাশের অসাধারন দৃশ্য আর রবি নদীর বয়ে চলাকে সাক্ষী রেখে চলে আসতেই পারেন এই সুন্দর শহরে, প্রকৃতির নির্জনতার মাঝে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে।






1 টি মন্তব্য:

আমার কলমে আমি বলেছেন...

বাহ; বেশ তথ্যমূলক লেখা।

সাম্প্রতিকতম লেখা

মায়ানগরী

                                  মায়ানগরী                                   শর্মিষ্ঠা দে ছোটবেলায় যখন চিত্রহার দেখতাম,ব...