মায়ানগরী
শর্মিষ্ঠা দে
ছোটবেলায় যখন চিত্রহার
দেখতাম,বরফে ঢাকা পাহাড়ে নায়ক নায়িকা নেচে নেচে গান গাইছে কিম্বা বিদেশের রাস্তায়
ফোয়ারার পাশে তাদের গান, অনেক সময়তেই সেসব দৃশ্য দেখে মনে হত একছুটে ওসব জায়গায়
যেতে পারলে কি ভালই না হত।
তা বলে না ইচ্ছা থাকলে
ঠিক কোন না কোনভাবে উপায় হয়েই যায়। বাইরে না যেতে পারি খোদ ভারতে বসেই সেইসব বাইরের দৃশ্য উপভোগের সুযোগ এসে গেল।
কিভাবে? সেই কথাই আজ বলব।
২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটা ট্রেনিং এর জন্য গিয়েছিলাম হায়দ্রাবাদ।আগে
অন্ধ্রপ্রদেশে থাকলেও এখন জায়গাটি তেলেঙ্গানা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।
তা শীতকালে দক্ষিনভারত
ঘোরার পক্ষে বেশ মনোরম।ট্রেনিং একদিন আগেই যখন শেষ হয়ে গেল তো কি মনে হল নেটে বসে
ওখানকার প্যাকেজ ট্যুর দেখতে গিয়ে চোখে পড়ল জায়গাটার কথা। সারাদিনের ট্যুর।ব্যস,
সাথে সাথে ফোন করে বাস বুক করে ফেললাম একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতার আশায়, অবশ্য নিরাশ
হতে হয়নি।
সকাল সকাল বাসে চেপে
চললাম।বেশ একঘণ্টার কাছাকাছি চলার পর একটা জায়গায় বাস থামল, সেখান থেকে সবাইকে জড়ো
করে আবার আরেকটা বাসে করে নিয়ে চলল, অবশেষে দেখতে পেলাম সেই বহু পরিচিত ফলক, বলিউড
কলিউড বা টলিউড এর বহু সিনেমার শুরুতেই দেখা যায় যে বিখ্যাত লোগোটি।
হ্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছেন।
আমি রামোজি ফিল্ম সিটির কথাই বলছি। শুরুতে যে গ্রুপ ড্যান্সের মাধ্যমে আমাদের অভিবাদন
জানানো হল তা এককথায় অনবদ্য।তারপর সবাই প্রবেশ করলাম মায়ানগরীর অন্দরমহলে।প্রথমেই
ছিল স্পেস স্টেশন। মাথা ঘোরে বলে এড়িয়ে গেলাম।
ভাবলাম বরং দেখে নেওয়া যাক ফিল্ম তৈরীর
খুঁটিনাটি।ধারাভাষ্য অনুসরণ করে যে বাড়িটিতে ঢুকলাম সেখানে দেখান হচ্ছিল ফিল্ম
কিভাবে তৈরী হয়। শ্যুটিং থেকে শুরু করে এডিটিং করে রিলিজ অব্ধি।আহা, নিজেকে ফিল্ম
এর কুশিলব বলেই মনে হচ্ছিল তখন।
এক জায়গায় দেখলাম সিনেমায়
ব্যবহৃত ভিন্টেজ কার রাখা ছিল কয়েকটা, জায়গাটা অনেকটা বিদেশের ধাঁচে বানান। তা
সবাইকে ছবি তুলতে দেখে আমিও তুলে ফেললাম একখানা নিজস্বী।
এরপর গেলাম এক নতুন শো
দেখতে- “লাইট ক্যামেরা অ্যাকশন”। ফ্লুরোসেন্ট লাইটে তাদের পারফরম্যান্স কিন্তু আজও
মনে গেঁথে আছে। সত্যিই অসাধারন কাজ ছিল।
আবার সারিবদ্ধ ভাবে চললাম
পরবর্তী কি দেখা যায় তা দেখতে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এখানে যতবার খুশি যত শো
দেখতে পারেন,কেউ কিছু বলবেনা। সারাদিন নিজের মত সময় কাটান। তবে এত বিনোদনের উপকরন
চারিপাশে ছড়ান যে একটা দেখার পর আর দ্বিতীয়বারের জন্য সময় পাওয়া যায়না।
যাক
নেক্সট দেখেছিলাম “দি স্ট্যান্টম্যান শো”।সিনেমাতে স্ট্যান্টের কাজ কিভাবে হয় তাই
দেখান হয়েছিল সেখানে, একটা ড্রামার মাধ্যমে।
এতক্ষন অবধি ঘুরছিলাম
কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছিলাম বেশ কিছুটা ঘোরার পর যে এই যে রামোজির এই বিভিন্ন
অনুষ্ঠানগুলি একেকটা বিভাগ বা স্পেশাল জোনে পড়ে। যেমন লাইট শোটা ছিল ইউরেকা
বিভাগের, আবার ফিল্ম তৈরী দেখেছিলাম স্পিরিট অফ রামোজিতে।
শো দেখে আশেপাশে ঘুরতে
ঘুরতে সামনে দেখলাম একটা অদ্ভূত দেখতে বাস, চেপে বসলাম সেটায়।দেখাই যাক এবারে আবার কি অভিজ্ঞতা হয়। বাসটা আমাদের নিয়ে চলল
ছায়াছবির দেশে। যেতে যেতে পড়ল তারা রা রাম্পম ছবির সেই ফোয়ারা, যার পাশে হয়েছিল ওই
সিনেমার টাইটেল সং এর দৃশ্য।আরে সত্যিই তো, আবার বিষ্ময় কাটতে না কাটতে দেখলাম মাহিশোর প্যালেস, মানে অবিকল তারই
আদতে গড়া। যার ভিতরটা নাকি আবার বৃন্দাবন প্যালেস। যত দেখছিলাম অবাক হয়ে
যাচ্ছিলাম। সত্যিই মায়ার দেশ।কি নেই এই দেশে- বিমানবন্দর , হস্পিটাল, একখন্ড
রাজস্থান থেকে শুরু করে জেলখানা সবই মজুত রামোজিতে।যেন সব পেয়েছির দেশ।
দেখলাম মাইথোলজিকাল
সেট।মনে হচ্ছিল আরে, মহাভারত সিরিয়ালে পাশার খেলার দৃশ্য , এখানেই তো হয়েছে। সব
কেমন যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ।
বাস নামিয়ে দিল এক সুন্দর
বাগানে। আরে, কি মজা, এখানেই তো ডার্টি পিকচার ফিল্ম এর “হু লা লা ” গানটির শ্যুটিং
হয়েছিল। ওই যেন দেখা যাচ্ছে বিদ্যা বালানকে, এমনটাই মনে হচ্ছিল। সবকিছু পরিপাটি
করে সাজান।
ছবি- এই ফোয়ারাটি মনে পড়ছে?
দেখলাম বাটারফ্লাই বাগানে
প্রজাপতির চাষ, রংবেরঙ এর পাখিদেরও দেখা মিলল এখানে, রামোজির বার্ড পার্কে।দেখতে
পেলাম বনসাই বাগানও।সেসব কথা লিখতে গেলে একদিনে শেষ হবেনা।
ফান্ডুস্তানে গিয়ে তো মনে
হছিল আমারও বুঝি বয়েসটা কমে গিয়েছে হঠাত করে।দাদাজিন লাইভ টিভি শো দেখে কখন যে
আমিও ছোটদের মত হাততালি দিয়ে উঠেছি জানিনা।বোরাবোরার গুহাতেও ছিল হাজার মজা।বৃষ্টিতে
যদিও ভেজা হয়নি, দূর থেকেই রেন ড্যান্স দেখে ক্ষান্ত হতে হল।
ছবি- মাইথোলজিকাল সেট
প্রায় ২০০০ একর জায়গার
উপর গড়ে ওঠা এই ফিল্ম সিটি তৈরীর অভিনব ভাবনাটি রামোজি গ্রুপের , যা পরবর্তীকালে
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফিল্মসিটি হিসাবে গ্রিনেজ বুক অফ রেকর্ডে নাম তুলেছে।সারাদিন
ঘরা,প্রচুর আনন্দ সবকিছুর সাথে এখানকার রেস্টুরেন্টে হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত
বিরিয়ানির স্বাদ নিতে ভুলিনি একেবারেই।
আর শপিং না করি,
মিনাবাজারে গিয়ে উইন্ডো শপিংটাও সেরে ফেলেছিলাম।
সাম্প্রতিক সুপারহিট ছবি
বাহুবলীর বিখ্যাত মাহেশমতির সেটটিও এখানেই
তৈরী করা হয়েছে। এখানে প্রবেশমূল্য ১২৫০ টাকা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য।
এছাড়া আছে স্পেশাল “বাহুবলী প্যাকেজ”, যার মূল্য প্যার ২৫০০ টাকার মত, যদিও এতে
খাবারের মূল্যও ধরা থাকে।
সারাদিনের প্রোগ্রাম
হিসাবে আপনার আগামী গন্তব্যে রাখতেই পারেন রামোজি ভ্রমণ, নিরাশ হবেননা।
চিত্রজগত থেকে বাস্তব
জগতে ফিরে আসার সময় মনপ্রান ভরে গেলেও একটা ছোট্ট ইচ্ছা রয়ে গ্যাছে, শুনেছিলাম
ভূতুড়ে জায়গা হিসাবে তালিকায় রামোজির নাম বেশ উপরের দিকেই। সেই অভিজ্ঞতাটা এবারের
মত বাকিই রয়ে গেল।সে নাহয় আবার অন্য কোন বারে হবে- এই ভেবে চললাম বাসে।পিছনে পড়ে
রইল রামোজি লেখা বিশাল ফলক – একা, নতুন মানুষের অপেক্ষায়।




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন