মঙ্গলবার, ২১ মার্চ, ২০১৭

ভূস্বর্গের ডায়রি থেকে

ভূস্বর্গের ডায়রি থেকে ...

সোচ কে ঝিলো কা শহর হো,লহরো মে আপনা এক ঘর হো”- ছবির মত সাজান ডাল লেক এর বুকে যখন হৃত্বিক আর প্রীতি এই গানটি গাইছিলেন কাশ্মীরের সুন্দর প্রকৃতি হাতছানি দিয়ে ডেকেছিল তখন থেকেই। কিন্তু সুন্দর আর আতঙ্কের মাঝে আতঙ্কেরই জয়  হয়েছিল।ইচ্ছা থাকলেও তাই সাহস করে পরিকল্পনা করা হয়ে আর উঠছিলনা।স্বপ্নের ভ্রমণ তাই অধরাই থেকে গিয়েছিল।

 তবে প্রকৃতির অমোঘ আকর্ষন বড় মায়াময়। চারদিকে কাশ্মীরের বিজ্ঞাপণী হাতছানি মনকে যেন বলল “চালাও পানসি কাশ্মীর।” আর ঘোরার ব্যাপারে যেহেতু বাঙালী বরাবরের হুজুগে,তাই সব আয়োজন করে ফেলতেও দেরী হলনা।

 ২০১৫ এর ষষ্ঠীর দিনে মাকে আগমনীর প্রণাম জানিয়ে সপরিবার চেপে বসলাম পুর্বা এক্সপ্রেসে।এতদিনে যাচ্ছি কাশ্মীর, ভূস্বর্গ দেখতে।তাই আলাদা আনন্দ।পরেরদিন নামলাম নিউ দিল্লী স্টেশনে,সেখান থেকে পুরনো দিল্লী।কারন আমাদের ট্রেন শালীমার এক্সপ্রেস ছিল সেখান থেকে।প্রদিন ভোরবেলা শালীমার নামিয়ে দিল জম্মুতে।ড্রাইভার আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, সুতরাং মারুতি ওয়াগনারে চেপে বসলাম আমাদের ভ্রমণ সফর শুরু করার জন্য।
জম্মু থেকে কিছুটা এগোবার পরেই বদলাতে লাগল দুপাশের দৃশ্যপট। পথের পাশের সবুজরঙা নদীটার বয়ে চলার ছন্দ অথবা পাহাড়ের ধাপে ধাপে আঁকাবাঁকা রাস্তার বায়োস্কপিক দৃশ্য- মন ভুলিয়ে রেখেছিল।কিন্তু রাস্তাঘাটে গাড়ি এত কম কেন?অনেকক্ষন ধরেই ভাবাচ্ছিল ব্যাপারটা।অবশেষে ড্রাইভারের মুখে শনা গেল সত্যিটা।ভয় পাব বলে নাকি এতক্ষন বলেনি আমাদের।ওখানে নাকি এখন গন্ডগোল চলছে।পাথর ছুঁড়ছে লোকের উপর।ভয় পেলেও এসে যখন পড়েছি তো দেখেই ফিরব।

থমথমে ভাবটা তখনো অবধি ঘিরে ধরেনি আমাদের, যখন ড্রাইভার বলেছিল “খিড়কি খোলকে মত রখনা ইস জগা পে, ইয়ে মিনি পাকিস্তান কহেলাতা হ্যায়”। পাথর ছোঁড়ার ভয়ে গাড়িটা খুব জোরে চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সে ওই বিপজ্জনক পাহাড়ি রাস্তা ধরে।জায়গাটার নাম বানিহাল।পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদী আর দুপাশের দৃশ্য ভুলিয়ে দিয়েছিল যেকোন মুহুর্তে ছুটে আসতে পারে পাথরের টুকরো।


“কাশ্মীর”- নামটার সঙ্গেই জড়িত অনেক ভয় আর বেশ কিছু স্মৃতি,যা মনে করায় একটাসময় পরিব্রাজকদের জন্য খুব একটা নিরাপদ ছিলনা এই জায়গা। তারপর কেটেছে অনেকটা সময়।পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে।আমরা ভ্রমণপিপাসু মানুষরা উপেক্ষা করে থাকতে পারিনি এই সুন্দরের হাতছানি।বহু সাধ আর সাধ্যের কষ্টসাধ্য মেলবন্ধন ঘটিয়ে এই বছর আয়োজন করেছিলাম ভুঃস্বর্গভ্রমনের।ভয়কে জয় করার মানসিকতা নিয়েই বেরিয়েছিলাম আমরা। এমনকী শ্রীনগর যেতে না পেরে সে রাত্রে যখন আমাদের গাড়ি পহেলগাঁও যাবার পথ ধরল গ্রামের মধ্যে দিয়ে ভয় পাইনি তখনও। অন্ধকার রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে কেবল আমাদের একটি মাত্র গাড়িই,আশেপাশে বহুদূর অব্ধি চোখে পড়ছেনা কোন আলোর রেখা।শুধু মাঝে মাঝে কোন একটি বা দুটি ঘরে দেখা যাচ্ছে টিমটিমে তেলের আলো।রাতের অন্ধকারে গ্রামের নাম দেখতে পাইনি।ভয় কাকে বলে প্রথম বুঝতে পারলাম যখন গাড়ী আটকে রাস্তার মাঝে জনাদশেক ছেলে আমাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে এসেছিল। তাদের মধ্যে দু-তিনজন গাড়ির কাঁচের মধ্যে দিয়ে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছিল ভিতরে বসে থাকা আমাদের।ড্রাইভারকে কাঁচ নামাতে বলে ‘কোথাকার গাড়ি,কোথা থেকে আসছে ইত্যাদি সব তথ্য জেনে সে যখন এটা বলেছিল, “লড়কি হ্যায়, জানে দো।” স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম।মনে হচ্ছিল এই মানবিক ব্যাবহারটুকু বুঝি খুব দরকার এখানকার পরিবেশ সম্পর্কে ভয় কাটাবার জন্য।
আরু ভ্যালি 


পরের সকালে শ্রীনগরের বদলে ঘুম ভাঙল পহেলগাঁওতে।ভূঃস্বর্গে আসছি বলে কথা,এটুকু ওলটপালট তো চলতেই পারে।এই বলে প্রকৃতির দিকে মনোনিবেশ করলাম গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ সহযোগে।তা প্রকৃতিও আমাদের এই উদারতার পুরস্কার অকৃপণ হাতেই দিয়েছিল,তার রূপের ডালি ভরে সাজিয়ে।আরু আর বেতাব উপত্যকার নয়নকাড়া রূপে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায়!বেতাব উপত্যকার নামকরন বেতাব ফিল্মের নাম অনুসারে। দেখলাম কোন জায়গায় নায়ক নায়িকা ছিলেন শুটিং চলাকালীন। বেতাব দেখে নিয়ে চললাম চন্দনবাড়ির উদ্দেশ্যে। অমরনাথ যাত্রার প্রথম সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে মনে মনে বলেছিলাম, ‘আবার যেন আস্তে পারি।’

বেতাব ভ্যালি

রাতের অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে পড়তে হচ্ছিল আমাদের অন্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।ড্রাইভাররা সব গাড়ি একসাথে যাবে,তাই অমন রাত থাকতে আমাদের তুলে দিয়ে ঘুরতে নিয়ে বেড়িয়ে পড়া।বেশ খানিকটা বিরক্তও লাগছিল। কি যে করে এরা। কিন্তু উপায় আর কি? তাই আধোঘুমেই রওনা দেওয়া।


পরের দিন পহেলগাঁও থেকে সরাসরি শোনমার্গ গিয়ে রাতের ঘুম বিসর্জন দেওয়াটাও উসুল হয়ে গেল প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার পরে।আমরা গাড়ি নিয়ে শোনমার্গ থেকে আরো আগে গেছিলাম জোজিলা পাস অবধি।ন্যাশানাল হাইওয়ে ১ডি এর উপর অবস্থিত এই জোজিলা পাস ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানী সেনা দ্বারা অধিকৃত হয়ে যায়।আবার যুদ্ধে জিতে সেটা জয় করতে হয়েছিল, যুদ্ধের স্মারক বানানো হয়েছে সেই স্থানে।কয়েক ইঞ্চি পুরু বরফের উপর বরফের গোলা নিয়ে খেলা করার সময় মনেই হচ্ছিলনা রাতজাগার ক্লান্তি আমাদের ছুঁতে পেরেছে।
শোনমার্গ

শোনমার্গ দেখে এসে সেই রাত্রিটা থাকলাম শ্রীনগরে।শ্রীনগর থেকেই পরবর্তী গন্তব্য ছিল গুলমার্গ।গুল অর্থাৎ ফুল। রংবেরং এর ফুলের সাথে আমাদের অতিরিক্ত পাওনা হয়েছিল তুষারপাত। সারা ভ্যালিজুড়ে সাদা বরফের চাদরে নিজেকে মুড়ে নেওয়া গুল্মার্গ সম্পূর্ন এক অন্য রূপে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল আমাদের। ঠান্ডাতে হাত পা সব ফেটে যাবার জোগাড়। তবু ওরই মধ্যে বরফ নিয়ে মজার খেলা।আর রোপওয়ে চড়া না হলেও আনন্দের ঘাটতি রইলনা।
বরফে ঢাকা গুলমার্গ


পরেরদিন আমরা রইলাম শ্রীনগরেই। ঘুরে দেখলাম ওখানকার স্থানীয় জায়গা- মুঘল গার্ডেন, শঙ্করাচার্জ মন্দির,শালীমার বাগ। গরম গরম ট্রাউট মাছ ভাজা ওই পরিবেশে আলাদা মাত্রা এনে দিল।
বিকালে ডাল লেকে শিকারা ভ্রমণ। লেকের উপর বসে সুস্বাদু কাওয়া চা পানের স্মৃতি অমলিন থাকবে মনের কোনে। এই ছোট ছোট জিনিসগুলোই তো জীবনে অন্য মাত্রা যোগ করে।
   
 
ডাল লেকে শিকারা 
কাশ্মীরকে প্রকৃতি ঢেলে দিয়েছে তার রূপের সম্ভার দিয়ে,একথা অস্বীকার করার নয় ফুলে ফলেও ভরিয়ে রেখেছে।আখরোট,আপেল,কেশর, টিউলিপের সম্ভারে ঢেলে সাজানো এই জায়গাটাকে এই কদিনেই ভালো বেসেছিলাম সেকথা বেশ বুঝতে পারছিলাম।
বরফ,ফুলের সমারোহ,ডাললেকের শিকারা ভ্রমণ থেকে কাওয়া,ট্রাউট মাছ- বাদ গেলনা কিছুই। কাশ্মীরের রূপ,রস, গন্ধ, বর্ন প্রাণভরে নিলাম আমার মধ্যে।কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও বাকি থেকে গেল আরও অনেককিছু।যেন দেখেও দেখা শেষ হলনা।যাই হোক না কেন, চিরযাযাবর জীবন ত আমাদের জন্য নয়, তাই সময়সীমা মেনে আবার এই কংক্রীটের জঙ্গলে ফিরতেই হবে। তবে বাকী থেকে গেল অনেককিছু,অনেক চেনাকেও আবার নতুন করে চেনা।তাই আসার আগে আবারও বলে এলাম এই অপরূপ  ভূঃস্বর্গকে -  “আবার আসিব ফিরে









কোন মন্তব্য নেই:

সাম্প্রতিকতম লেখা

মায়ানগরী

                                  মায়ানগরী                                   শর্মিষ্ঠা দে ছোটবেলায় যখন চিত্রহার দেখতাম,ব...